আশমিন
ইট পাটকেল(ছোট গল্প)
সানজিদা বিনতে সফি
আমজাদ চৌধুরীর সাথে কথা শেষ করার আগেই আশমিনের ফোনে কল এসেছে। তাই দ্রুত ফোন নিয়ে বাগানের দিকে ছুটেছে সে। ঠিক তিন মিনিটের মাথায় তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি হয়ে গেলো। হতভম্ব আশমিন কান থেকে ফোন সরানো তো দূর চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। কয়েক মুহুর্ত অতিক্রম হতেই চোখ ঘুড়িয়ে উপরে তাকালো সে। তার বাড়ির ছাদেই নূর বালতি হাতে দাঁড়িয়ে। নূরের মুখের ক্রুর হাসি আশমিনের বিস্ময় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিলো। কপালে কয়েকটা ভাজ পরে সাথে সাথেই তা মিলিয়ে গেছে৷ তার পরিবর্তে ঠোঁটে জায়গা করে নিলো শয়তানি হাসি। কাছের আত্মীয় স্বজনরা ছাড়া বাড়িতে তেমন লোক নেই। বাগানের দিকে আশমিনের কয়েকজন বডিগার্ড ছিল। ঘটনার সাথে সাথেই তারা আশমিন কে ঘিরে দাঁড়িয়ে। একজন ছাদে ছুটেছে নূর কে পাকড়াও করতে।
বডিগার্ড ছাদে উঠেই নিজের পা থামিয়ে দিলো। নূরের পিছনে একই রকম দেখতে দুটো ছেলে দাঁড়িয়ে। একজন গম্ভীরমুখে দাঁড়িয়ে থাকলেও আরেকজন বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে। বোনের পিছনে দাড়িয়ে থাকতে এই মুহুর্তে তার ভালো লাগছে না। মাখো মাখো একটা প্রেম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তার। কিন্তু নূরের হটাৎ তলবে সব পন্ড হয়ে গেলো।
-- দাড়িয়ে কেন? আমাকে ধরতেই তো এসেছো মনে হচ্ছে। এদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই (অমি আর আশিয়ান কে দেখিয়ে)। এরা আমার জজন্মসূত্রে পাওয়া বডিগার্ড। তেমন কিছু করবে না,সুধু,,,
নূরের কথা শেষ হওয়ার আগেই আশমিন এসে সেখানে উপস্থিত হয়েছে। আশমিনের কাদায় মাখা মুখ আর দেখে আশিয়ান হু হা করে হেসে উঠেছে৷ হাসতে হাসতে কখনো নূরের পিছনে চলে যাচ্ছে তো কখনো অমি'র পিছনে চলে যাচ্ছে। আশমিনের কপাল খানিকটা কুচকে আছে। অমি অসহায় মুখ করে ভাই বোন কে দেখছে। কাকে কাদা জল মাখিয়েছে তারা কি বুঝতে পারছে না! এখান থেকে বেচে ফিরবে কি না তা ও তো ভাবতে হবে।
আশমিন হুট করেই কাদা নিয়েই আশিয়ান কে জড়িয়ে ধরলো। আশিয়ানের সাদা পাঞ্জাবির পিছনের দিকটায় চাপড়ে দেয়ার ছলে হাতের কাদার ছাপ লাগিয়ে শান্ত গলায় বলল,
-- কিছু মনে করো না ছোট ভাই। ভবিষ্যৎ সম্বন্ধী কে দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারি নি। তাই কোলাকুলি টা সেরে নিলাম। গাল বাড়িয়ে দিলে চুমু টাও খেয়ে নেয়া যেতো। প্রথম সাক্ষাতে এতটা বাড়াবাড়ি ঠিক হবে না তাই বাদ দিচ্ছি। পরের বার হবে ইনশাআল্লাহ।
অমি নাক চুলকানোর ভান করে নিজের হাসিটা আড়াল করে নিলো। আশিয়ানের মুখটা দেখার মতো হয়েছে। নূরের ঠোঁট দুটো আপনা আপনি ফাকা হয়ে গেছে।
আশমিন শয়তানি হেসে আশিয়ান কে ছেড়ে নূরের দিকে এগিয়ে গেলো। সামনা সামনি দাঁড়িয়ে অমির দিকে তাকাতেই অমি হালকা হেসে আশিয়ান কে নিয়ে ছাদের অপর পাশে চলে গেলো।
-- তোমাদের কি যাওয়ার জন্য পায়ে ধরে বলতে হবে? নাকি ম্যাডাম কে কতটা ডেস্পারেটলি চুমু খাবো তা দেখতে দাঁড়িয়ে আছো। আমি রাজনীতি করি বলে চরিত্রহীন ভেবেছ? এত্ত বড় সাহস!
বডিগার্ড তিনজন তড়িঘড়ি করে সিড়ি দিয়ে নেমে গেলো। আশমিন কুচকানো ভ্রু সোজা করে নূরের দিকে তাকালো। নূর ভাবলেশহীন ভাবে দাঁড়িয়ে।
-- রাস্তায় বখাটের মতো গালি দেয়া মেয়েটা তুমিই ছিলে? (হালকা হেসে)। দিন দিন বেয়াদব হচ্ছো নূর। এমন ভরা বাড়িতে খোলা জায়গায় কেউ এভাবে কাউকে ভেজায়? ভেজাতে হলে রুমে আসো। আমাকেও একটু ভিজানোর সুযোগ দাও। হতাশ হবে না।
নূর চেচিয়ে উঠতে গিয়েও থেমে গেলো। তার বাবা কিভাবে এমন নির্লজ্জ লোকের সাথে তাকে বিয়ে দেয়ার কথা ভাবতে পারে! চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দাতে দাত পিষে বলল,
-- অসভ্য মানুষ। একদম লজ্জা নেই না?
শেষের কথা টা কিছুটা চেচিয়ে ই বললো নূর। আশমিন নিজের মুখটা যথেষ্ট সিরিয়াস করে রাশভারি গলায় উত্তর দিলো,
-- না। বিয়ের ন'মাসের মাথায় আমি বাবা হয়ে তোমার শ্বশুরকে চমকে দিতে চাই। তাই লজ্জা পাওয়ার রিস্ক নিচ্ছি না। তোয়ার উচিত আমাকে সহযোগিতা করা। চলো এখুনি বিয়ে টা সেরে নেই। ভিতর থেকে প্রেম বেড়িয়ে আসার জন্য লাফালাফি করছে। বেশিক্ষণ চেপে রাখতে পারবো না। আর চেপে রাখার ইচ্ছেও নেই।
আশমিনের গম্ভীর গলা শুনে নূর থতমত খেয়ে গেলো। কয়েকবার আঙুল তুলে কিছু বলতে গিয়েও মুখ থেকে কোন আওয়াজ বেরুলো না। মনে মনে চিৎকার করে বলল, আমি আপনাকে কখনো বিয়ে করবো না বেহায়া পুরুষ।
আশমিন কিছুটা চিন্তিত গলায় নূর কে বললো,
-- দেখো,আমি এখন নিচে যাচ্ছি। বাকি কথা বিয়ের পরে হবে। আর কিছুক্ষণ থাকলে ঠাস করে চুমু খেয়ে বসবো। তবে তোমার যদি এতে আপত্তি না থাকে তাহলে আমি আরো কিছুক্ষণ থাকার রিস্ক নিতে পারি। জনগণের সেবা করাই আমার কাজ।
নূর স্তব্ধ হয়ে গেল। আশমিনের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে তার সব-কয়টা দাত ভেঙ্গে দেয়ার প্রবল বাসনা মনে চাপা দিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে নিচে চলে গেলো৷ আশমিন কিছুক্ষণ আগেই তার বাবার কাছ থেকে মেসেজ পেয়েছে তার নূরের সাথে বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছে। এখন এই কাদায় মাখামাখি হয়ে আমজাদ চৌধুরীর কাছে গিয়ে তাকেও সুখবর টা দিতে হবে।
আমজাদ চৌধুরী সিড়ির নিচেই দাঁড়িয়ে। মূলত সে ছেলের জন্যই দাঁড়িয়ে আছে। আশমিনের গায়ের কাদা প্রায় শুকিয়ে। ছেলের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি
আর চেপে রাখলো না। আমজাদ চৌধুরীর হাসির মাঝেই আশমিনের নজর কামিনী চৌধুরীর উপর পড়লো। সানভি কে কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি। আশমিন গম্ভীর গলায় ডাকলো,
-- আম্মু।
-- হ্যা আব্বু, বলো।
কামিনী চৌধুরী দ্রুত পায়ে এসে দাড়িয়েছে ছেলের সামনে। ছেলের অবস্থা দেখে কিছুটা বিচলিত সে। সানভি নিজেও অবাক চোখে তাকিয়ে। এরকম দৃশ্য জীবনে প্রথম দেখছে সে৷
-- তোমার বর এখানে মেয়েদের পিছু পিছু ঘুরছে। এই বয়সে এসে তার এসব কেন করতে হবে। এখন, এইমাত্র একটা মেয়েকে দেখে দাত বের করে হেসেছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি। ভার্সিটির কথা মনে আছে তো? তোমার সামনেই কতো মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করেছে। তুমি ভুল করেছ আম্মু। আমি আরেকটু ভালো বাবা ডিজার্ভ করি।
আশমিন মন খারাপের ভান করে নিজের রুমে চলে গেলো। বাকিটা কামিনী চৌধুরী সামলে নিবেন। সানভি করুণ চোখে আমজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে। এরকম ছেলে শত্রুর ও না হোক।
কামিনী চৌধুরী আগুন দৃষ্টিতে আমজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আছে। সানভি থাকবে না চলে যাবে সেই দ্বিধায় ভুগছে।
-- সানভি(চিৎকার করে)।
-- ইয়েস ম্যাম,,
-- তোমার স্যারের জন্য ছাদের রুমটা খুলে দাও। আজ থেকে সে সেখানেই ঘুমাবে।
আমজাদ চৌধুরীর মুখটা শুকিয়ে গেলো। কিছুটা আকুতি ভরা গলায় বলল,
-- এসব কি বলছো সোনা। আমি একা কিভাবে,,
-- তাহলে কি এখন আরেকটা বিয়ে করতে চাও?
কামিনী চৌধুরীর কটমট গলা শুনে আমজাদ চৌধুরী দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
-- আস্তাগফিরুল্লাহ! এসব কি বলো কামু। বিয়ে করবো কেন?
-- তাহলে কি বিয়ে ছাড়াই লিভ টুগেদার করতে চাইছো! চরিত্রহীন পুরুষ। আমি কাল ই ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাবো।
আমজাদ চৌধুরী বাকহারা হয়ে গেলো। এই ধমকি গত একত্রিশ বছর ধরে শুনে আসছে সে। কিছুটা মিনমিনে গলায় বলল,
-- ছেলেকে একা পাঠালে হয় না?
কামিনী চৌধুরী গটগট পায়ে নিজের রুমে গিয়ে খিল দিলেন। সানভি চাবি নিয়ে অনেকক্ষণ আগেই ছাদে চলে গেছে। এসব দেখে দেখে তার সংসার থেকেই মন উঠে গেছে। সাবান কে ভালোবাসে বলেই এখনো সমাজে থাকছে। নাহলে কবেই সে নির্বাসন নিত।
চলবে,,
