আশমিন
ইট পাটকেল(ছোট গল্প)
সানজিদা বিনতে সফি
রাফসান শিকদার চিন্তিত মুখে আমজাদ চৌধুরী কে লাগাতার কল করছে। আমজাদ চৌধুরী অসহায় চোখে ফোনের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে ফোন উল্টে রেখে দিয়েছে৷ ছেলের এমন নির্লজ্জ কর্মকাণ্ডে সে খুব বিরক্ত। কিন্তু তার এই বিরক্তি কে আশমিন পাত্তা দিচ্ছে না। সে এই রাতদুপুরে মসজিদের মাওলানা সাহেব কে কল করে বিয়ের বিষয় নিয়ে আলোচনায় ব্যাস্ত। আমজাদ চৌধুরী মুখ কালো করে বসে রইলেন। তার কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। কিশোরী মেয়েদের মতো মুখ ফোলাতে ইচ্ছে করছে তার। ছেলের দিকে অভিমানী চোখে তাকালেন একবার। ওমনি আশমিন ভয়ার্ত গলায় বলল,
--এভাবে তাকাচ্ছো কেন! তুমি নিশ্চয়ই আমার প্রেমিকা ছিলে না। এমন ভাব করছো যেন আমি তোমায় ঠকিয়ে অন্য মেয়ে নিয়ে সংসার করছি৷ আমি এই অপবাদ একদম মেনে নিবো না আব্বু!
ছেলের কথায় মোটেও ভড়কালেন না সে। উল্টো খাট থেকে নামতে নামতে বলল,
-- আমি তোমার মায়ের কাছে যাচ্ছি। ছেলের কৃতকর্ম তার ও জানা উচিত। আমি এখানে চিন্তায় মরবো আর সে আড়াম করে ঘুমাবে তা তো হতে দেয়া যায় না।
আশমিন কষ্ট পাওয়ার ভান করে বলল,
-- নানাজান অত্যন্ত স্বার্থপর একজন মানুষের সাথে আমার আম্মুর বিয়ে দিয়েছে। তিনি তো আর জানতেন না,তার পছন্দ করা পাত্র আমার আম্মু কে নিয়ে যে হিংসায় জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়! নিজের মেয়ের সর্বনাশ কেউ এভাবে করে? তুমিই বলো?
আমজাদ চৌধুরী বিস্মিত গলায় বলল,
-- আমি কখন হিংসা করলাম!
-- তুমি শুধু আম্মু কে নয়, আমাকেও হিংসে করো।
-- বাজে বকা বন্ধ করো। সব সময় আজে বাজে কথা! বাবা হই তোমার। হিংসে করবো কেন?
-- এই যে আমি সুন্দরী দেখে একটা মেয়ে কে বিয়ে করছি তা তোমার সহ্য হচ্ছে না। মনে মনে তুমি হিংসায় জ্বলছো। কয়েকদিন পর যখন আমি ডজন খানেক বাচ্চার বাবা হয়ে যাবো তখন তুমি আরো জ্বলবে। তুমি তো আবার মাত্র এক বাচ্চার বাবা। কম্পিটিশনে আমি এগিয়ে ।
আমজাদ চৌধুরী রাগ করতে গিয়েও দ্বিধায় পরে গেলেন। বিরক্তিতে মুখ কুচকে ঝাজালো গলায় বললেন,
-- সেই একটা বাচ্চা নেয়াও আমার ভুল হয়েছে। তার মাশুল আজ পর্যন্ত দিচ্ছি।অসভ্য ছেলে। ভদ্রতা পুরোটা গিলে খাচ্ছো দিন দিন। তুমি বিয়ে করলে আমার হিংসে হবে কেন? আশ্চর্য!
আশমিন অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
-- হবে না! তাহলে আয়োজন না করে ভাংতি দিচ্ছো কেন। আর কথা বলে অযথা আমার সময় ই বা নষ্ট করছো কেন?
আমজাদ চৌধুরী আতকে উঠে বলল,
-- আমি তোমার সময় নষ্ট করছি!
আশমিন পাঞ্জাবির বোতাম লাগাতে লাগাতে উদাস গলায় বলল,
-- তুমি ছাড়া এখানে আর কেউ নেই আব্বু।
আশমিনের উদাস মুখ টা দেখে আমজাদ চৌধুরীর মায়া হলো। তার মন বিদ্রোহ করে বলল, আয়োজন ছাড়া বিয়ে হওয়া কোন বিষয় নয়। ছেলের আপতত বিয়ে করা জরুরি। তাই এইটুকু করলে দোষের কিছু হবে না।
-- এভাবে বসে না থেকে তোমার বন্ধু কে বলো মেয়ে কে নিয়ে আসতে। আমি কিন্তু লেট করবো না। ব্রাশ করার ও কোন দরকার নেই। অযথা সময় নষ্ট। বিয়ের পরে আমি নিজ হাতে ব্রাশ করিয়ে দিব।
আমজাদ চৌধুরী বির বির করতে করতে "নির্লজ্জ" বলে বেড়িয়ে গেল। এখানে থাকা মানে নিজের কান কে অপবিত্র করে ফেলা। কামিনী নিশ্চয়ই এই ছেলে কে পেটে নিয়ে উল্টো পালটা কিছু খেয়েছে। নাহলে এমন বজ্জাত ছেলেই তার হবে কেন?
এই শেষ রাতে কেন সানভি কে ঘুম থেকে তুলে আনা হয়েছে সে বুঝতে পারছে না। দেয়ালে হালকা হেলান দিয়ে একটু পর পর হাই তুলছে সে। তবে আশমিন কে কোন রকম প্রশ্ন করছে না।
আশমিন কামিনী চৌধুরীর রুমে গিয়ে তাকে ঘুম থেকে তুলে একটা ভয়ংকর কথা বলে ফেলেছে। সবার কাছে ভয়ংকর মনে হলেও আশমিনের চিন্তা দেখে মনে হচ্ছে সে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তিত। কামিনী চৌধুরী ছেলের কপালে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,
-- কি হয়েছে বাবা!উল্টো পালটা বকছো কেন? তুমি কি ড্রিংক করেছো!
কামিনী চৌধুরীর গলায় স্পষ্ট আতংক। আশমিন গম্ভীর গলায় বলল,
-- না আম্মু৷ আমি ভালো ছেলে। আপাতত বউ কে কি গিফট করবো তা নিয়ে চিন্তিত। ভালো কোন গয়না থাকলে আমাকে দাও। ইউনিক কিছু, যেমন মনে করো, বংশের বিখ্যাত কোন হার, বা চুরি।
কামিনী চৌধুরী ভয়ার্ত গলায় বলল,
-- বউ কোথা থেকে আসবে বাবা! তুমি কি বিয়ে করেছো?
আশমিন মুখটা আরো গম্ভীর করে ফেললো, গলার স্বর মোটা করে বলল,
-- করি নি। আব্বু আমার জন্য মেয়ে ঠিক করেছে। রাতভর অনুরোধ করেছে যাতে আজ ফজরের পরেই আমি বিয়েটা সেরে ফেলি। অবশেষে আমাকে রাজি হতেই হলো। একমাত্র বাবা বলে কথা। আবদার তো আর ফেলতে পারি না। আমার চোখ দেখো,সারারাত না ঘুমানোর ফলে লাল হয়ে আছে৷ সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ে করে একবারেই ঘুমাবো।
কামিনী চৌধুরী বিস্মিত হয়ে চেয়ে রইলেন। সানভির ঘুম পালিয়ে গেছে। সে আপাতত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমজাদ চৌধুরীর জন্য তার বুক ফেটে কান্না আসছে। এমন ছেলে তার নিস্পাপ স্যারের ই কেন হতে হলো!
কামিনী চৌধুরী কটমট গলায় বলল,
-- তোমার আব্বু কোথায়?
-- বিয়ের আয়োজন করতে গেছে। তুমি আমাকে গলার হার টার টাইপের কিছু দাও। আমি এখন ব্যাস্ত।
কামিনী চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলমারি খুলে একটা নতুন হার বের করে দিলেন। খুব একটা বড় নয়। হালকার মধ্যে, তবে ডিজাইন সুন্দর।
-- নানাজানের মেয়ের জামাইয়ের জন্য আমার এভাবে বিয়ে করতে হচ্ছে আম্মু। তোমার বাবা কাজটা ঠিক করেন নি। এর একটা বিহিত চাই আমি।
আশমিন চলে গেছে। কামিনী চৌধুরীর নিজের স্বামীর উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। এভাবে বিয়ে হয়! একমাত্র ছেলে তার, ধুমধাম করে বিয়ে করাবে। অথচ তাকে জানানোর ও প্রয়োজন মনে করলো না৷ কাল ই সে বাপের বাড়ি চলে যাবে৷ এমন লোকের সাথে সংসার করার মানেই হয় না।
হুট করেই বিয়ে হয়ে যাবে এমন ভাবনা নূরের মস্তিষ্কের ধারে কাছে ও ছিল না। তাও ফজরের পর পর! এটা কোন বিয়ে করার সময় হলো!
নূর বাড়ির সাধারণ পোশাকে বসে আছে আশমিনের রুমে। এলোমেলো চুল, ফোলা ফোলা চোখ দেখে আশমিন বুকে হাত দিয়ে তড়িঘড়ি করে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। তার সামনে এমন সাংঘাতিক ভাবে বসে থাকার মানে কি। চুমু টুমু খেয়ে ফেললে তাকেই আবার অসভ্য বলা হবে। রীতিমত পুরুষ নি*র্যাতন!
আমজাদ চৌধুরী অনেক কষ্টে রাফসান শিকদার কে বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছে। রাফসান শিকদার রুষ্ট মনেই মেয়েকে নিয়ে হাজির হয়েছেন। অমি আর আশিয়ান ভ্যাবাচেকা খেয়ে বসে আছে তখন থেকে।
আশমিন রুমে গিয়ে দেখে নূর মুখ কুচকে বসে আছে।
-- এভাবে বিয়ের মানে কি! কোন নষ্ট গল্প আছে নাকি? নেতাদের বিশ্বাস নেই। এভাবে চুপিচুপি বিয়ে করা তো সেই ইঙ্গিত ই দিচ্ছে।
আশমিন পাঞ্জাবির বোতাম খুলতে খুলতে বলল,
-- নিজেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ ভাবার কিছু নেই। আশমিন জায়িন চৌধুরীর একটা তুড়ি তে কয়েকশ মেয়ে এসে হাজির হয়ে যাবে। নেহাৎ ই আব্বু জোর করেছে। তোমাকে বিয়ে করার জন্য মরে যাচ্ছিলাম না আমি।
নূর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো আশমিনের দিকে। চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,
-- বাজান তুড়ি। আমিও দেখি দেশের কোন মেয়ের রুচি এতো খারাপ৷
আশমিন টপাটপ নূরের গালে চুমু খেয়ে ফেলল। বিস্ময়ে হা হয়ে যাওয়া নূরের মুখের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,
-- একদম আমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করবে না। দূরে যাও। নেহাৎ ই আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারি না। নাহলে তোমাকে চুমু খাওয়ার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।
চলবে,,
