আশমিন
ইট পাটকেল(ছোট গল্প)
সানজিদা বিনতে সফি
থমথমে মুখে ড্রয়িং রুমে বসে আছে আশমিন। আমজাদ চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। আপাতত তার দুনিয়ায় কোন বিষয় নিয়ে আগ্রহ নেই। কাল বিকেলে ঢাকায় ফিরেছে তারা। কামিনী চৌধুরী স্বামীর রাগ করে নিজের বাপের বাড়ি চলে গিয়েছেন। কামিনী চৌধুরীর বড় ভাই শমসের চৌধুরী ফোন করে কয়েক বার নিজের দাপট বুঝিয়েছেন।
-- তুমি থাকতে আমার বউ কি করে বাপের বাড়ি চলে গেল আব্বু! তোমার উচিত ছিল শ্বশুর হিসেবে তাকে ধরে বেধে ছেলের সাথে নিয়ে আসা।
আমজাদ চৌধুরী শান্ত গলায় বললেন।
-- তুমিও তো ওখানেই ছিলে। তুমি কিছু বললে না কেন?
আশমিনের মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। সে চোখ মুখ কুচকে বলল,
-- আমি তো ভালো ছেলে। তাই কিছু বলতে পারি নি৷ এখন দেখছি ভালো ছেলে হওয়া মোটেও ভালো কথা নয়। দেখলে তো, কিভাবে ধরা খেয়ে গেলাম! সব তোমার জন্য হয়েছে। বাবা হিসেবে তুমি শূন্য পেয়েছো। যাকে বলে ফেইল।
-- বুড়ো বয়সে তোমার জন্য বউয়ের বড় ভাইয়ের ঝাড়ি খাচ্ছি। তোমার আম্মু আমাকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে। আমি কি তোমাকে কিছু বলেছি? আমার দিকে আঙ্গুল তোলা বন্ধ করো।
আশমিন হতভম্ব হয়ে গেল। অসহায় হওয়ার ভান করে বলল,
-- তুমি আমার উপর প্রতিশোধ নিলে! ষড়যন্ত্র করে আমাকে বউ হারা করে দিলে তুমি! এই দিন দেখার জন্য আমি তোমাকে বাবা হিসেবে চুজ করেছিলাম?
আমজাদ চৌধুরী বিরক্ত হলেন। টিভির রিমোট টা রেখে হনহন করে নিজের রুমে চলে গেলেন। এখানে থেকে এমন বাজে কথা শোনার কোন মানেই হয় না।
আশিমন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। নূর ইচ্ছে করেই যে তাদের সাথে আসেনি তা সে খুব ভালো করেই জানে। মেয়েটা এভাবে হুট করে বিয়ে করার প্রতিশোধ নিচ্ছে। আশমিনের মন টা খুব খারাপ হয়ে গেল। এভাবে বউ ছাড়া থাকার কোন মানে হয়। সকাল সকাল বিয়ে করে কি লাভ হলো!
আশমিন আজ তার বাবার অফিসে এসেছে। সচরাচর সে অফিসে খুব একটা আসে না। আমজাদ চৌধুরী ছেলেকে দেখে নিজের ব্যাক্তিগত কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে রইলেন। আশমিন যে কোন ভালো উদ্দেশ্যে আসে নি সে একশ ভাগ শিউর।
-- আব্বু কোথায় সান?
সানভি অসহায় চোখে এদিকে সেদিক তাকালো। আমজাদ চৌধুরীর জন্য তার ছোট্ট মনে বিশাল মায়া।
-- স্যার অফিসে নেই হয়তো। চলুন স্যার, আজ আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। এসপি সাহেব অপেক্ষা করছে।
-- সেও অনেক কেই অপেক্ষা করায় সান। তাই নিজেও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুক। আমি আব্বুর সাথে দেখা করেই যাবো।
আমজাদ চৌধুরীকে খবর পাঠানো হলেও সে আসলো না। আশমিন নিজের কেবিনে আড়াম করে বসে খুব গুছিয়ে তার বাবা কে একটা মেসেজ পাঠালো। দশ মিনিটেই আমজাদ চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে আশমিনের সামনে এসে বসলো।
-- আমি গ্রামে যাচ্ছি আব্বু। তাই তোমাকে দেখতে এলাম৷ কয়েক ঘন্টা আমাদের দেখা হবে না। আমি তোমাকে খুব মিস করবো।
আমজাদ চৌধুরী বিরক্ত গলায় বললেন,
-- যা বলার সরাসরি বলো। তোমাকে আমার ভালো করে চেনা আছে।
-- দেখেছো! আমার বাবা বলেই তুমি এতো ইন্টেলিজেন্ট। আচ্ছা যাই হোক, আমি শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি৷ আসার পর থেকে নূর ফোন রিসিভ করছে না। আমার মতো একটা অসাধারণ মানুষ কে মেয়েটা কত ভালোবাসে ভাবো একবার! আমার কল দেখে খুশিতে কল রিসিভ ই করতে পারে না। আমার উচিত মেয়েটাকে আরো বেশি ভালোবাসা। তাই আমি নিজেই তার কাছে চলে যাচ্ছি৷ তোমার জন্য কি কিছু আনতে হবে?
-- চোখের সামনে থেকে বিদায় হও। কাজের সময় এসে বিরক্ত করছো কেন?
আশমিন আমজাদ চৌধুরীর কথা মোটেও গায়ে মাখলো না। সে এখানে এসেছে অন্য উদ্দেশ্যে। গলা খাকারি দিয়ে সিরিয়াস গলায় বলল,
-- আমি একটা ডিল করতে চাইছি মি. চৌধুরী। এতে আপনার ও সমান লাভ আছে।
-- আমি কোন ডিলে আগ্রহী নই। যেতে পারো।
আশমিন আমজাদ চৌধুরীর কথায় কান না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-- নিজের জীবন বাজি রেখে আপনার স্ত্রী কে আমি গিয়ে তার বাবার বাড়ি থেকে তু*লে আনবো। আপনার কথা ভেবে আমি নিজের রেপুটেশন সাইডে রেখে এতো বড় রিস্ক নিচ্ছি। আপনার উচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে আপনি নূর কে বুঝিয়ে ঢাকা নিয়ে আসবেন। ব্যাস,,এটুকুই।
আশমিনের কথা শুনে সানভির ইচ্ছে হলো সাত তলা থেকে লা*ফ দিয়ে জীবন দিয়ে দিতে। সামান্য একটা কথা এভাবে বলার মানে কি! আশ্চর্য!
আমজাদ চৌধুরী মুখটা ভোতা করে বসে রইলেন। ইহজগতের মায়া সে ত্যাগ করেছেন। এখন আর সংসারে থেকে লাভ নেই। কাল ব্যাগ গুছিয়ে সে হিমালয়ে চলে যাবে। এমন স্ত্রী সন্তান তার চাই না।
-- আপনার কাছে আর কোন অপশন নেই মি.চৌধুরী । আমার প্রস্তাবে রাজি না হলে আমি আপনার স্ত্রী কে বলে দিব আপনি তার অগোচরে আপনার কলেজ বান্ধবীর সাথে কেএফসি তে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেন।
আমজাদ চৌধুরী উত্তেজিত গলায় বললেন,
-- মিথ্যা কথা। তুমি আমাকে ফাসাচ্ছো! নিজের বাবার সংসার ভাঙ্গতে চাইছো?কেমন ছেলে তুমি?
-- ভালো ছেলে। আপাতত আমি যাচ্ছি৷ মিটিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে কাল সকাল হবে। রাতে আপনার স্ত্রীকে কিড*ন্যাপ ও করতে হবে। অনেক কাজ।
আমজাদ চৌধুরী হতভম্ব গলায় বললেন,
-- ওটা তোমার নানার বাড়ি। তুমি গেলেই তোমার আম্মু চলে আসবে। এভাবে বলার মানে কি।
-- তুমি গেলেও নূর চলে আসবে। তাহলে যাচ্ছো না কেন? মিনিমাম রেস্পন্সিবল না তুমি। বিরক্তিকর বাবা একটা।
দুনিয়ায় সমস্ত বাজে কথা বলে নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠে চলে গেল। আমজাদ চৌধুরী ক্লান্ত গলায় বলল,
-- আমি কি এমন বললাম সানভি?
সানভি নিজেও খুব অসহায় বোধ করছে।
-- জানি না স্যার।
উত্তর দিয়ে দেড়ি করলো না সে।আশমিন অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আশমিনের পিছনে ছুটলো সে৷ আমজাদ চৌধুরীর মন মেজাজ ভালো নেই৷ বিজনেস খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। কামিনী চৌধুরী না থাকায় বিজনেস সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে সে। তাই অতো না ভেবে নূর কে আনতে যাওয়াই তার ঠিক মনে হলো। এই ছেলের বিশ্বাস নেই। দেখা গেল বউয়ের কাছে তাকে ভাইরাল করে দিয়েছে।
সকালে কামিনী চৌধুরী কে নিয়ে বাসায় ফিরেছে আশমিন। দুই দিনের ধকলে খুব ক্লান্ত সে। সানভির হাত থেকে কামিনী চৌধুরীর লাগেজ টা নিজের হাতে নিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,
-- বাসায় যাও সান। লুবানা অপেক্ষা করছে।
কৃতজ্ঞতায় সানভির চোখে পানি চলে এল। আজ কতদিন ধরে বাসায় যায় না সে। মনে মনে আশমিনের জন্য দোয়া করে ফেললো তৎক্ষনাৎ। ঠিক তখনই আশমিন বো*মা ফেললো।
-- লুবানা কে তার বাবার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এগারোটায় অফিসে চলে আসবে। আমি অফিসে পৌঁছে যাব।
সানভির চোখে এবার ও পানি এলো। কেন এলো কে জানে! মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না সে। চুপচাপ চলে গেল।
আশমিন রুমে এসে দেখলো এক সুন্দরী রমনী তার বিছানায় খুব আয়েস করে ঘুমাচ্ছে। আশমিন হাসলো। দূর থেকে কয়েক পলক দেখে ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। নূর জেগেই ছিল। এতদিন আশমিন কে সে খুব জ্বালিয়েছে। ইচ্ছে করেই তার কল রিসিভ করে নি। মাঝরাতে আশমিনের দুষ্টু মেসেজ তার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। এখন কাছে আসতেই তার হাত পা কাপছে। তবুও সে শক্ত হয়ে পরে থাকলো। কিছুতেই আশমিন কে বুঝতে দিবে না সে জেগে আছে।
আশমিন ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানার বসতেই একটা সুন্দর ঘ্রাণ নূরের নাকে এসে লাগলো। আশমিন নূরের দিকে ঝুকে শক্ত করে তার গলায় কামড়ে দিল। নূর চিৎকার করার আগেই আশমিন ফিসফিস করে বলল,
-- বলেছিলাম না,জ্বালিয়ো না।কামড়ে দিবো। এখন আমার দোষ দিতে পারবে না। আমি ভালো ছেলে।
কামড়ে দেয়া জায়গায় কয়েকটা চুমু খেয়ে সরে এলো সে। হতভম্ব নূরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
-- ভালো ছেলে বলেই আদর করে দিলাম। তোমার মতো কামড়াকামড়ি করার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। আমার অবাধ্য হয়ে আমাকে খারাপ ছেলে করার চেষ্টা করবে না।
নূর হতভম্ব হয়ে রিয়্যাক্ট করতেও ভুলে গেল। আশমিন ততক্ষণে তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরেছে। কয়েক ঘন্টা ঘুমাবে সে।
চলবে,,
