আশমিন
ইট পাটকেল(ছোট গল্প)
সানজিদা বিনতে সফি
প্রচন্ড গরমে হাসফাস অবস্থা। আশমিনের যেন গরম একটু বেশিই লাগছে। এক অজানা কারণে তার খুব রাগ হচ্ছে। রাগে চুলের গোড়ায় গোড়ায় ব্যাথা করছে। তবুও সে চুপচাপ বসে আছে। তার রাগের একমাত্র কারণ তার বউ। যে বর্তমানে সবগুলো দাত বের করে বন্ধুদের সাথে কথা বলছে৷
আশমিন রেগে আছে বোঝাতে কয়েকবার সানভি কে ধমক ও দিয়েছে। তবে সেদিকে ধ্যান নেই নূরের। সানভি অবশ্য মিন মিন করে একবার জানতে চেয়েছে,
-- আমি কি করেছি স্যার!
-- এখন তুমি কিছু করবে,আর আমি ধমক দেয়ার জন্য এই আশায় বসে থাকবো? তোমার মর্জি মতো আমাকে ধমক দিতে হবে!
সানভির মুখটা অমাবশ্যায় ছেয়ে গেল। আশমিন কে আর কিছু বলার সাহস হলো না। কারণ সে যাই বলুক না কেন, আশমিন ত্যাড়া জবাব ই দিবে।তাই আগের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
ব্যাস দুই মিনিটেই আশমিনের ধৈর্য ভেঙে গেল। সে উঠে ধুপধাপ পা ফেলে নূরের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বেরিয়ে গেল।
-- আরে কি করছেন! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে?
-- আমরা ঘুরতে যাচ্ছি।
-- এতো রাতে ঘুরতে যাবো কেন! এটা আপনার শহর নয়। এটা গ্রাম। বিপদ হতে পারে।
-- হলে হোক। আমি কি কাউকে ভয় পাই নাকি?
আশমিনের কাটকাট কথায় নূর আর কিছু বললো না। তবে তার প্রচুর মেজাজ খারাপ হচ্ছে৷ গাড়িটা ও নিয়ে আসে নি৷ মাঝরাতে এভাবে গ্রামের রাস্তায় হাটার কোন মানে হয়!
কিছুক্ষণ যাওয়ার পর আশিমিনের মনে হলো সে নিজের ফোন টা আনতে ভুলে গেছে। তার সাথে কোন গার্ড ও নেই। যে কোন সময় তারা বিপদে পরতে পারে। সানভি গাধাটা ও তাদের পিছন পিছন আসে নি।
আশমিন চিন্তিত হয়ে নূরের দিকে তাকালো। নূর বিরক্ত চোখ তার দিকেই তাকিয়ে৷ আশনিন ভড়কে গেল৷ হালকা কেশে গম্ভীর গলায় বলল,
-- এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? তোমাদের বাড়ি এসেছি। তোমার উচিত ছিল দিনের বেলায় আমাকে গ্রাম ঘুরে দেখানো।তা না করে রাতে নিয়ে এসেছো৷ এখন আমাকে প্রোটেকশন দাও। আমাকে সেফ রাখা এখন তোমার দায়িত্ব।
রাগে নূরের গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। পারলে আশমিন কে এখুনি জ্বালিয়ে দিত সে।
-- আপনি অসহ্যের চুড়ান্ত লেবেল পার করে গেছেন। আমি আপনাকে নিয়ে এসেছিলাম? আপনি নিজেই আমাকে জোর করে নিয়ে এসেছেন।
-- একদম আমাকে ফাসানোর চেষ্টা করবে না৷ আমি মোটেও তোমাকে জোর করি নি।
নূর হতাশ হয়ে তর্ক করা ছেড়ে দিলো। রাত প্রায় বারোটা বাজাতে চলেছে। রাস্তায় এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মোটেও সেফ নয়।
-- চলুন বাড়ি ফিরে যাই। সবাই চিন্তা করবে।
-- যাবো না। এই, তুমি কি আমাকে ভিতু মনে করছো? আমাকে দেখে তোমার দূর্বল পুরুষ মনে হয়! একদম আমার পুরুষত্বের দিকে আঙ্গুল তুলবে না। আমি একজন শক্ত সামর্থ মানুষ। নিজের বর কে দূর্বল বলতে তোমার লজ্জা করলো না।
নূর অবাক হয়ে কথা বলতেও ভুলে গেল। হাতে একটা ছু*রি থাকলে এক কো*পে ধর থেকে মাথা টা আলাদা করে দিতো৷ নূর কিছু বলতে যাবে তার আগেই দেখলো আশমিন তীক্ষ্ণ চোখে অন্ধকারে তাকিয়ে আছে। এ যেন অচেনা এক আশমিন। আশমিনের এই দৃষ্টির সাথে সে পরিচিত নয়। আশমিন নূরের একটা হাত শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় বলল,
-- চলো।
আশমিন দ্রুত পায়ে হেটে যাচ্ছে। নূর থতমত খেয়ে বলল,
-- আরে কি করছেন! পরে যাবো তো।
-- কথা না বলে চুপচাপ থাকো। মেয়ে মানুষের বেশি কথা আমার পছন্দ নয়।
-- বেশি কথা কখন বললাম! এভাবে গরুর মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছেন তাই বললাম।
-- তুমি এখন কি চাও? তোমাকে কোলে করে চুমু খেতে খেতে নিয়ে যাই? ছিঃ। বর কে দেখে আর লোভ সামলাতে পারছো না তাই না? লোভী মেয়ে।
কথা বলতে বলতে আশমিন নূর কে নিয়ে একটা ঝোপের আড়ালে চলে গেছে। টের পেতেই নূর চেচিয়ে উঠলো।
-- এখানে এনেছেন কেন! ছাড়ুন আমাকে। তখন থেকে বাজে বকে যাচ্ছেন। কান খুলে শুনে রাখুন, আপনার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই৷ শুনেছে অসভ্য পুরুষ।
আশিমিন নূরের মুখে চেপে ধরে তীক্ষ্ণ চোখে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-- চেচাচ্ছো কেন!নিজের বরের প্রতি আগ্রহ নেই বলে নিজেকে বেয়াদব প্রমাণ করায় কোন বাহাদুরি নেই। আসো কোলে নেই।
নূর এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। মশা কামড়ে পা ফুলিয়ে ফেলেছে। আশমিনের দৃষ্টি এখনো রাস্তায়।
কয়েকজন ছেলে হন্য হয়ে কাউকে খুজছে। হাতে তাদের ধারালো অস্ত্র। নূরের গলা শুকিয়ে গেল। সে ভীতু গলায় বলল,
-- আমাদের মারবে নাকি!
-- নাহ, আদর করবে।
আশমিনের সোজা জবাব।
-- এভাবে বসে আছেন কেন! ওদের গিয়ে মেরে আসুন। আপনি তো খুব সাহসী।
আশমিন ভ্রু কুচকে তাকালো। পাঞ্জাবীর হাতা গোটাতে গোটাতে বলল,
-- সাহসী হয়েছি বলে এখন আমার জীবন দিতে হবে! এই পেট মোটা মাতালদের অস্ত্রে দুই ভাগ হয়ে সাহসের প্রমাণ দিতে হবে? শোন মেয়ে, আমি কিছুতেই এই কুৎ*সিত গু*ন্ডা*দের সাথে মারা*মারি করবো না। আমার পাঞ্জাবি নষ্ট হয়ে যাবে। ভালো ছেলেরা মারা*মারি করে না।
নূর হতভম্ব হয়ে গেল। অধৈর্য গলায় বলল,
-- আমি আরো সুন্দর পাঞ্জাবি কিনে দিবো। প্লিজ এই ঝামেলা থেকে আমাকে রক্ষা করুন।
-- কিন্তু তোমার তো আমার প্রতি কোন আগ্রহ নেই। আমি জনগণের সমর্থন ছাড়া কাজ করি না।
নূর বিরক্ত হয়ে বসে রইলো। যে হারে মোশা কামড়াচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে এমনিতেই রক্ত শূন্যতায় মারা যাবে। তাই অযথা এই বিরক্তকর লোকের সাথে তর্ক করে লাভ নেই।
আশিমিন কিছুক্ষণ মোচড়া মুচড়ি করে বলল,
-- পিঠ টা চুলকে দাও তো। কিছুতেই হাত পৌছাচ্ছে না। মনে হয় মশা কামড়েছে।
নূর ক্লান্ত গলায় বলল,
-- পারবো না। জনগণ আপনার পাশে নেই।
আশমিন আড়চোখে নূর কে দেখে নিলো। মেয়েটার বিরক্ত মুখ দেখে তার প্রেম পাচ্ছে। মশা মারার বাহানায় কয়েকটা চুমু খাওয়া গেলে ভালো কিছুটা ভালো লাগতো।
যেই ভাবা সেই কাজ। নূরের গালে পরপর কয়েকটা চুমু খেয়ে সোজা হয়ে বসলো সে। নূর চিৎকার করতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো। কটমট করতে করতে দাতে দাত চেপে বলল,
-- লজ্জা সরম কি বেচে খেয়েছেন? এমন ছিঃ মার্কা কাজ কারবারের মানে কি!
আশিমিন বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল,
-- একদম আমাকে দোষ দিবে না। আমি জনপ্রতিনিধি। জনগণ পাশে নেই মানে আমার জন্য দুঃসংবাদ। তাই আদর করে জনগণ পটানোর চেষ্টা করছি।
-- বাজে কথা বলা বন্ধ করুন। আরেকবার আমার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে আমি আপনাকে খু*ন করে ফেলবো।
আশমিন তেতে গেলো। বিরক্ত গলায় বলল,
-- মানুষের ভালো করতে নেই। গালে মশা বসেছিল। থাপ্পড় দিয়ে তো আর মারতে পারি না। কারণ আমি ভালো ছেলে। অথচ এখন আমার উপরে ই অভিযোগ করা হচ্ছে৷ বউ পেটানোর মতো খারাপ ছেলে আমি নই। সব দোষ মশার। যা বলার মশা কে বলো।
রাস্তার ছেলে গুলো কিছুক্ষণ খোজাখুজি করে চলে গেছে। আশমিন তবুও বের হচ্ছে না।
-- ওরা চলে গেছে। চলুন বাড়ি ফিরে যাই।
-- যাবো না। শ্বশুর বাড়ি এসে যদি এমন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা লাগে তাহলে সেই শ্বশুর বাড়ি যেয়ে কি হবে! কোন সিকিউরিটি নেই! আমরা এখন ঢাকা ফিরে যাবো।
-- বললেই হলো! আমি দুই মাস এখানেই থাকবো। আপনি চলে যান।
-- তর্ক করবে না। আমি রেগে গেছি।
নূর আশমিনের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সত্যি ই রেগে গেছে কি না। আশমিন দুই হাত পিছনে ভর দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে আছে। মনে হচ্ছে সে এই ঝোপঝাড় আর মশার কামড় খুব এনজয় করছে। আশেপাশের অনেকের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আশমিন উকি দিয়ে দেখলো সানভি গার্ডদের নিয়ে তাকে খুজছে। নূর খুশি হয়ে বলল,
-- সানভি এসেছে। এবার চলুন।
-- না। আজ সারা রাত ও আমাদের খুজবে। এটাই ওর শাস্তি। এমনিতে ও কাল থেকে ওর চাকরি নেই। আজ রাত মন ভরে ডিউটি করুক।
নূরের ইচ্ছে হলো খুচিয়ে এই লোকটাকে রক্তাক্ত করে ফেলা। এই অসহ্য লোকের সাথে সে কিছুতেই থাকবে না। বাসায় গিয়েই বাবাকে বলবে, তার ডিভোর্স চাই। চাই মানে চাই।
চলবে,,
