আশমিন
ইট পাটকেল(ছোট গল্প)
সানজিদা বিনতে সফি
ধুলো উড়া দুপুরে ক্লান্ত কাক টাও যেন বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বসে হাই তুলছে। চারিদিকে আলসে দৃষ্টি দিয়ে কাটফাটা রোদে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নূর। ক্লান্ত চোখে চারিদিকে চোখ বুলাচ্ছে। সূর্যের উত্তাপে চামড়া ঝলসে যাওয়ার যোগাড়।
পিছনে কারোর অস্তিত্ব অনুভব করতেই আগুন্তকের দুহতের বেড়াজালে আটকে পরলো সে।
- এভাবে নিজেকে রোদে না পুড়িয়ে আমার উত্তাপে পোড়াতে পারো তো। আমি কিন্তু সূর্যের মতো রূঢ় নই।
আশমিনের মোহনীয় বাক্য মুহুর্তেই নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে নূরের। কয়েকপল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে। আশমিন ও প্রেয়সীর সান্নিধ্যে থাকার লোভ সামলাতে পারলো না। লেপ্টে দাঁড়িয়ে রইলো নূরের সাথে।
বুকের দামামা দ্রুত গতিতে চলছে নূরের। নূরের কাপতে থাকা দেহ কে আরেকটু কাপিয়ে দিতে কানের কাছে ফিস ফিস করে বলল,
- তোমাকে পোড়াতে এসে তোমার উত্তাপে তো আমিই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছি! ভিতরে এসো, এসির হাওয়ায় দুজন একসাথে পুড়বো।
নূরের কান গরম হয়ে গেল। আশমিন ঠোঁট টিপে হাসলো। নূর কনুই দিয়ে ঠলে সরিয়ে দিলো আশমিন কে। কাপা কাপা গলায় রাগ দেখানোর চেষ্টা করে বলল,
- ব বাজে কথা বলবেন না। মাথায় কখনো ভালো চিন্তা আসে না তাই না? নষ্ট পুরুষ কোথাকার!
আশমিনের কপাল কুচকে গেল। তার মতো শান্তশিষ্ট ভদ্র শিশুর মতো মানুষ কে নষ্ট বললো! এ কেমন অবিচার! এই মেয়েতো কলি কালের সবচেয়ে জঘন্য অপবাদ তার ঘাড়ে লাগিয়েছে। আশমিনের গম্ভীর গলায় বলল,
-- আমার মতো ভালো ছেলে পুরো পৃথিবী তন্নতন্ন করে খুজলেও পাবে তুমি? না চাইতেই পেয়ে গেছো তো, তাই কদর করছো না।
-- ইসসস, আপনার ভালো পনা দেখলে গা জ্বলে যায় আমার। দূরে থাকুন বেহায়া পুরুষ।
-- আমি তোমার কাছে কখন গেলাম? যথেষ্ট দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছি।
নূর হতভম্ব চোখে তার সাথে লেপ্টে থাকা মিথ্যুক মানুষ টাকে দেখলো। কাপা কাপা গলায় বলল,
-- তাহলে আমার সাথে লেপ্টে কে দাঁড়িয়ে আছে! মানুষ ঠিকই বলে, নেতারা মিথ্যুক ই হয়।
আশমিন নিজেদের দুরত্বে আরেকটু ঘুচিয়ে নিলো। বুকের কাছে লেপ্টে থাকা মেয়েটার থুতনি ধরে তার মুখোমুখি করে মন্থর গলায় বলল,
-- এখনো আমাদের দূরত্ব অনেক মিসেস চৌধুরী৷ যেদিন আমাদের দূরত্ব কমবে সেদিন আমাদের লোমে লোমে সংঘর্ষ হবে৷ আবরণের সাথে আবরণের নয়। বুঝেছেন?
নূর নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আটকে যাওয়া গলায় বলল,
-- সরুন,,
-- কেন?
-- নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
-- আমি সাহায্য করবো?.
নূর এক ঝটকায় সরে এলো। কাপা কাপা আঙ্গুল তুলে শাসানোর চেষ্টা করে দ্রুত পায়ে চলে গেল। আশমিন ঠোঁট কামড়ে হাসলো। বউকে ভালোই ভড়কে দেয়া গেছে। সারাদিনের তিরিক্ষ মেজাজ টা এখন কিছু টা আয়ত্তে এসেছে৷
ফ্রেশ হয়ে আশমিন নিচে এসে চুপ করে আমজাদ চৌধুরীর পাশে গিয়ে বসলো। আমজাদ চৌধুরী নড়েচড়ে বসলো। চশমার উপর দিয়ে ছেলের দিকে তাকালো।
-- এমন বখাটে ছেলেদের মতো তাকাচ্ছো কেন!
আমজাদ চৌধুরী মুখ কুচকে ফেললো। চোখ ঘুরিয়ে টিভি দেখায় মন দিল সে।
-- অফিসে যাচ্ছো না কেন? সারাদিন বাসায় বসে কি করো তুমি?
আমজাদ চৌধুরী নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো
-- আমি অবসর নিয়েছি।
-- অবসর নিয়েছো মানে! কেন? কি এমন বয়স হয়েছে তোমার? এখনো সতেরো তে আটকে আছো। হ্যাঁ, দুই এক দিন এদিক সেদিক হতে পারে। এই কচি বয়সে অবসর নেয়ার মানে কি আব্বু!
আমজাদ চৌধুরী বিরক্ত চোখে তাকালো ছেলের দিকে।
-- বাজে বকো না তো! কোন প্রয়োজনীয় কথা না থাকলে যাও এখান থেকে।
আশমিন গম্ভীর গলায় বলল,,
-- আমি অপ্রয়োজনীয় কথা বলি না আব্বু। তোমার অফিস থেকে জরুরি কিছু তথ্য অন্য কোম্পানির কাছে পাচার হয়ে গেছে৷ একাউন্টস এ ও গোলমাল। বিশ্বস্ত কাউকে অফিসে এপোয়েন্ট করা উচিত।
আমজাদ চৌধুরী চিন্তিত চোখে তাকালেন ছেলের দিকে।
-- তোমার জানাশোনা কেউ আছে নাকি? কারোর কথা ভেবেছো?
-- অবশ্যই আছে। আমার বউ কে তোমার চোখে লাগে না! সারাদিন তো বাসায় ই বসে থাকে। অফিসে গেলে সময় ভালো কাটবে।
-- না না। তা কি করে হয়! মেয়েটার কাধে এতো বড় দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। কতটুকুই বা বয়স!
আশমিন চটে গেল। ঘাড়ে হাত বুলিয়ে অসহায় হওয়ার ভান করে বলল,
-- ওকে ছোট বলো না বাবা! কিছুক্ষণ আগেই তোমার শিশু বউ মা আমাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছিলো। আমি সচেতন পুরুষ বলেই বেচে গেছি।
-- ও তোমাকে পুড়িয়ে মারতে চাইছিলো!
-- হ্যা।
-- কিভাবে!
-- ছেলের ব্যাক্তিগত বিষয় জানতে চাইছো! তোমার লজ্জা নেই?
-- আরে! তুমি ই তো বললে!
-- আমি কখন বললাম! আমার ঘাড়ে দোষ চাপাবে না। এতো কৌতুহল কেন তোমার!
আমজাদ চৌধুরী চরম বিরক্ত চোখে তাকালো ছেলের দিকে। আশেপাশে তাকিয়ে কামিনী চৌধুরী কে খুজলো। কাউকে না পেয়ে নিজেই উঠে চলে গেলো। আশমিন সরু চোখে তার বাবার যাওয়া দেখলো। পৃথিবীর সব চেয়ে নাটকীয় বাবা আল্লাহ তাকে দিয়েছে। আফসোসে তার পেট মোচড় দিচ্ছে। সে কপাল কুচকে ফোনে মনোযোগ দিলো। নূরের অফিস যাওয়ার ব্যাপার টা সুরাহা হলো না। সে সারাদিন বাইরে বাইরে থাকে। তার ছোট একটা বউ বাড়িতে পরে পরে তার চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপার টা মেনে নেয়া যায় না। বাসায় এলেই বউ দূরে দূরে থাকে। তখন তার নিজেকে করোনা ভাইরাস মনে হয়। বউ তাকে দেখলেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে। কোন ভাবে অফিসে জয়েন করাতে পারলে দিনের অর্ধেক টা সময় তার সামনেই থাকবে। বউয়ের সাথে প্রেম টাও তখন একটু মাখো মাখো হবে। এই বাবা টা কিছু বোঝে না।
Ent
