ইট পাটকেল পর্ব : ১

Md. Jubayer
0


 


আশমিন

ইট পাটকেল(ছোট গল্প)

সানজিদা বিনতে সফি


বৃষ্টিতে ভেজা কর্দমাক্ত রাস্তায় শো শো করে এগিয়ে যাচ্ছে গোটা বিশেক গাড়ি। মেঘলা আকাশ আর সামান্য ঝর বৃষ্টি মিলে পরিবেশ কিছুটা বৈরী।  রাস্তায় এখানে সেখানে পানি জমে ছোট ছোট ডোবার আকার ধারণ করেছে।  আশমিন কিছুটা বিরক্ত মুখেই গাড়িতে বসে। তার বৃষ্টি পছন্দ নয়।  সবচেয়ে বেশি অপছন্দ মাটির স্যাতস্যাতে গন্ধ। নাকে ঢুকতেই মাথা ধরে যায়।  ড্রাইভারের পাশে সানভি করুণ মুখে বসে আছে। আজ সারাদিন খুব সাবধানে কাটাতে হবে।  কোন কাজ এদিক সেদিক হওয়া যাবে না। নাহলে আশমিন ঠান্ডা মাথায় তাকে এক সপ্তাহের জন্য কাজের অযুহাতে আটকে দিয়েছে। উদ্দেশ্য বউ থেকে দূরে রাখা।  সে আবার বউ ছাড়া থাকতে পারে না। অনেক কষ্টে সাবানার বাবাকে পটিয়ে বিয়ে করেছে। শুধু বউয়ের সাথেই ভাব ভালোবাসা জমাতে পারছে না। তাও আশমিনের জন্য।  মাঝে মাঝে আশমিন কে তার বাংলা ছবির ভিলেন বাপ মনে হয়।  আজ তার সাবানাকে নিয়ে কুয়াকাটা যাওয়ার কথা ছিল। আশমিন নিজেই তাকে বুদ্ধি দিয়েছিল লুবানা কে সারপ্রাইজ দিতে।  সব কিছু যখন রেডি ঠিক সেই মুহুর্তেই সে তাকে নিয়ে তার গ্রামের বাড়িতে হাজির। তার নাকি গ্রামের পুকুরে মাছ ধরতে ইচ্ছে করছে।  কয়েক মাস আগে বারোটা ছাগল কিনে দিয়েছিল কেয়ারটেকার কে। সেই ছাগল ছানা দেখার জন্যও মন আনচান করছে।  এসব ভুজুংভাজুং বলে সকাল সকাল তাকে নিয়ে গ্রামে রওনা হয়েছে। দুঃখে সানভির চোখ ভিজে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর।  দুনিয়াতে এতো চাকরি থাকতে তাকে মন্ত্রীর ই কেন এসিস্ট্যান্ট হতে হলো! তার আর সংসার করা হবে না সে বুঝে গেছে। এর পরেও তার সাবানা তার সাথে থাকবে!


"মতি চাচা কে কল করে বলেছো আমি আসছি?"


সানভি বিরস মুখেই বললো, 


-- জ্বি স্যার।  আসার আগেই বলেছি। 


-- আর কতক্ষণ? 


-- আধঘন্টা লাগবে। 


আশমিন আর কিছু বললো না।  পাশে বসা আমজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে মুখ কুচকে রইলো।  এটা ঠিক সে সকাল সকাল তাকে তুলে এনেছে। তাই বলে সারা রাস্তা ঘুমিয়ে কাটাবে! সারা রাত ঘুমায় নি নাকি? কামিনী চৌধুরী তো দুই দিন আগেই গ্রামের বাড়ি চলে এসেছে। তাহলে তার বাবা রাতে  জেগে করেছে টা কি? বাকি আধঘন্টা তার ভালোই কাটবে মনে হচ্ছে। 


-- আব্বু,


আমজাদ চৌধুরী নড়েচড়ে উঠলো।  সকাল সকাল বেরুতে তার মোটেও ভালো লাগে না।  তার উপর কাল থেকে তার মন মেজাজও খুব একটা ভালো না। ছেলের ডাক কে পাত্তা না দিয়েই জানালার দিকে হেলান দিয়ে বসলেন। এখন পাহাড় ধসে পরলেও সে চোখ খুলবে না। 


-- শুনলাম রাত জেগে সোসাল মিডিয়ায় মেয়েদের বিরক্ত করছো? আম্মু গিয়েছে দুই দিন হয়নি। তাতেই তোমার এই অধপতন। এখন বুড়ো বাপের নামেও ইভটিজিং এর বিচার আসবে বাসায়! বুড়ো বয়সে কচি মেয়ের দিকে নজর দিতে তোমার বুক কাপলো না!  সামলাতে পারার ও একটা ব্যপার আছে তো নাকি?


আমজাদ চৌধুরীর ইচ্ছে করলো গাড়ির নিচে মাথা দিয়ে নিজের মাথা পিষে ফেলতে।  নির্লজ্জ ছেলে জন্ম দিয়ে পৃথিবীতে বেচে থাকার কোন মানে হয় না। সে দাত কটমট করতে করতে বললো,


-- বাজে কথা বন্ধ করো বেয়াদব ছেলে।  বাবা হই তোমার।  বেয়াদবি করলে চা*পকে ছাল তুলে নিবো অসভ্য ।  


সানভি অসহায় মুখ করে বসে আছে।  এখন তার কোন কিছুতেই খুব একটা আফসোস হয় না। আগে হতো। বড় স্যারের জন্য তার প্রচন্ড মায়া হতো।  এখন ব্যপার টা গা সওয়া হয়ে গেছে। 


-- আমাকে কাছে স্ক্রিনশট আছে। গত বারের কথা ভুলে যাওনি নিশ্চিহ্ন? 


আমজাদ চৌধুরীর মুখটা শুকিয়ে গেলো। বাবা ছেলের কথার মাঝেই তাদের বিলাসবহুল গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে হালকা ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। 


রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা একঝাঁক তরুণী মুহুর্তেই কাদা পানিতে  মাখামাখি হয়ে গেলো।  তাদের মধ্যে কেউ একজন খুবই বিশ্রী ভাষায় গালিও  দিয়েছে।  যা শুনে আপাতত স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আশমিন। আমজাদ চৌধুরীর মুখও কিছুটা হা হয়ে আছে।  সানভি  হা হা করে হেসে উঠেও মুখ বন্ধ করে ফেলেছে।  


-- গা*লি কি আমাদের দিলো সান?


-- হ্যা স্যার।


-- এটা একটা মেয়েই ছিল  তো?


সানভি মুখটা করুন করার চেষ্টা করে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললো।  মুখ খুললেই ফুট করে হাসি বেরিয়ে আসবে। অনেকদিন ঈদের মতো খুশি লাগছে। আশমিন কে হতভম্ব হতে দেখে কলিজায় যেন বরফ পরেছে। শান্তি! 


আমজাদ চৌধুরী ছেলের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে  মনে মনে হাসিতে ফেটে পড়লো।  ঠিক হয়েছে। আল্লাহ বিচার করেছে। 


থমথমে মুখে চৌধুরী বাড়িতে প্রবেশ করলো আশমিন। আজ তার দাদার রুহের মাগফেরাতের জন্য এলাকার কিছু এতিম বাচ্চাদের খাওয়ানো হবে। আল্লাহ হয়তো সেই উছিলায় তাদের গুনাহ গুলো মাফ করবেন। 

ছেলেকে দেখেই কামিনী চৌধুরী সব কাজ রেখে ছুটে এসেছেন।  বাড়ি ভর্তি মানুষ।  আশমিন মায়ের সাথে কথা বলে নিজের রুমে চলে গেলো।  ফ্রেশ হয়ে তারাতাড়ি সবার সাথে দেখা করতে হবে।  প্রায় চারমাস পর গ্রামে এসেছে সে। 

আমজাদ চৌধুরী আপাতত বউয়ের আসে পাশে ঘেষছে না।  ছেলের যন্ত্রণায় তার জীবন অতিষ্ঠ।  


অতিথিদের মধ্যে আমজাদ চৌধুরীর শিশুকালের বন্ধু রাফসান শিকদার তার পুরো পরিবার নিয়ে উপস্থিত।স্ত্রী, যমজ দুই ছেলে আর এক মেয়ে তার পরিবার। ছেলে দুটো হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিচ্ছু। তারা আপাতত কোণায় দাড়িয়ে সুন্দরী মেয়েদের লিষ্ট করছে। 

আর মেয়ে তেহজিব নূর তার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। পড়াশোনা শেষ করে আপাতত বাবার বিজনেস দেখছে। 

আশমিন নিচে আসতেই নূরের মুখ ভয়ংকর ভাবে কুচকে গেল।  বাবার হাত ছেড়ে গটগট করে বন্ধুদের কাছে গিয়ে দাড়ালো।  আশমিন শান্ত চোখে দেখলো। মেয়েটা কি তাকে দেখেই মুখ বাকালো! আশ্চর্য! 


খাওয়াদাওয়া শেষে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিল নূর। তাদের মধ্যে তার বন্ধু আদিল একটা মেয়েকে দেখে আফসোসের শিষ তুললো।  চোখ ঘুড়িয়ে আসে পাশে নজর বুলিয়ে বললো, 


-- আজকাল মেয়েরা জিরো সাইজ বডি বানাইতে গিয়া একেকটা কংকাল হইতাছে দোস্ত। ধইরা মজা নাই।  মাইয়া মানুষ হইবো বালিশের মত। বুকে জড়াইলে কলিজা ভইরা যাইতে হইবো।  এই মাইয়া বিয়া করলে হাড্ডি  গুনতে গুনতে জীবন শেষ।  মজা নাই ভাই মজা নাই।  


নূর প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে তাকালো আদিলের দিকে।  সাথে দাড়ানো বাকি বন্ধু গুলোও সায় জানিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে তাকে। 


-- তা ঠিক বলেছিস দোস্ত। তবে স্লিম ফিগার আজ তোদেরই চাহিদা।  ক্যাটরিনা কাইফের মতো বউ চাই কিন্তু মজা পাওয়ার জন্য আবার তার শরীরে মাংস থাকতে হবে।  যদি বউয়ের ও এমন কিছু চাহিদা থাকে তাহলে তোর তো সার্জারী করতে হবে দোস্ত। 


নূরের কথায় চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো সবাই। পিছনে আশমিনের বিষম লেগে পানি মাথায় উঠে গেছে।  কি সাংঘাতিক! হন্তদন্ত হয়ে আমজাদ চৌধুরীর কাছে হাজির হলো সে। সবার ভিতর থেকে কিছুটা জোর করেই রুমে এনে গম্ভীর গলায় বলল, 


-- বিয়ে করবো আব্বু। মেয়ে পছন্দ হয়েছে৷ যত তারাতাড়ি সম্ভব কাজটা সারতে চাচ্ছি।  তোমার মতো এক বাচ্চা পয়দা করে ফুলস্টপ লাগানো টা ঠিক হবে বলে মনে হচ্ছে না।  তাই তারাতাড়ি বউ চাই।  


আমজাদ চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।  কি বেয়াদব!  নির্লজ্জের মতো বিয়ের কথা বলছে। ভালো করে বললে কি সে না করতো? 


চলবে,,



সমস্ত পর্ব পড়তে ক্লিক করুন 

All Part


Post a Comment

0Comments

Post a Comment (0)