গল্প তাঁর চোখে আমার সর্বনাশ
অন্তিমপর্ব
নাজমুন_নাহার
ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো
তোমার মনের মন্দিরে
আমার পরানে যে গান বাজিছে তাহার তালটি শিখো
তোমার চরণমন্জীরে
ধরিয়া রাগিয়ো সোহাগে আদরে আমার মুখর পাখি তোমার
প্রাসাদপ্রাঙ্গণে....
মনে করে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী
তোমার কনককঙ্কণে
ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো
তোমার মনের মন্দিরে.....
অতিরিক্ত সুখে মানুষ বোধহয় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে। আমার অবস্থাও হয়েছে সেরকম। প্রশান্তির সাগরে ঢুবে রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। বিশেষ কোনো দিনে মনুষ্য জাতির খানিক বেশি বিশেষ অনুভূতি হয়তো হয়। কিন্তু আমার অনুভুতি রা আজ বিশেষদের বিশেষত্বও ছাড়িয়ে গিয়েছে। চারিদিকে যেনো প্রজাপতিদের নৃত্য দেখতে লাগলাম আমি। বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও আমার চোখে মুক্ত ঝরে পড়ার দৃশ্য বলে মনে হতে লাগলো। একটা শীতল হাওয়া কোথা থেকে উড়ে এসে উড়িয়ে দিতে চাইলো আমার চুল। হৃদয়ের গহীনে থেকে কেমন বসন্ত বসন্ত সুবাস ভেসে আসছে আজ। একটা মিষ্টি সুর কানের কাছে এসে বারবার আমাকে জানান দিয়ে যাচ্ছে, এটাই বুঝি সে-ই কাঙ্ক্ষিত গোধূলি লগন। আর যাকে নিয়ে আমার মনে এতো আনন্দ আনন্দ খেলা হচ্ছে সে-ই কাঙ্ক্ষিত মানুষটি এই মুহূর্তে আমার সামনে বসে। আমি তৃপ্তিময় লজ্জায় আড়ষ্ট হয়েও মুখ তুলে একপলক তাকালাম তার মাতাল করা চোখদুটোতে ।উপলব্ধি করলাম সে-ই মানুষটিও আকাশ সমান মুগ্ধতা নিয়ে অক্লান্ত,পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সীর মুখপানে। মুহুর্তেই আমার বুকের ভেতর প্রশান্তির ঝড় বয়ে লন্ডভন্ড করে দিতে চাইলো আমার সারা শরীর। আমি নিশ্চুপ খানিক তাকিয়ে রইলাম তার স্নিগ্ধ মুখে। মুক্তার দানার মতো জ্বলজ্বল করতে থাকলো তার অবিশ্রান্ত চোখ দুটো। ঠোঁটের কোনে লেপ্টে আছে আজন্ম অক্ষত এক মিষ্টি হাসি! সে চোখের ইশারায় আমাকে জানালো এক শুভক্ষণের শুভেচ্ছা বার্তা। সৃষ্টিকর্তাও বুঝি এই শুভদৃষ্টিতে মৃদু হাসলেন। আলোরা হয়ে গেলো আরো নরম। চিরন্তন হয়ে রইলো শুধু দুই জোড়া দৃষ্টি!
কেমন কাকতালীয়ভাবে আমার বিয়েটা হয়ে গেলো আমি টেরই পেলামনা। মানুষের জীবনে এমনই কিছু চমৎকার সত্য থাকে যা তাঁদের নিকট নিছকই স্বপ্ন কিংবা কল্পনা হয়ে ভেসে বেরিয়েছে। সে-ই কল্পনার বাস্তবিকতা দেখতে পাওয়া তাঁদের জন্য চাঁদ হাতের মুঠোয় পাওয়ার মতো দুঃসাধ্য বিষয়। অতঃপর বাস্তবে সে-ই কল্পনা ধরা দিলেও তাঁরা বিশ্বাস করতে পারে না। আমিও পারছি না। এখনও মনে হচ্ছে, এ বুঝি বাস্তব নয় কেবলই ডে ড্রিম । এই বুঝি আমার ধ্যান ভাঙলো বলে।
আব্বু যে এতো সহজে অভ্রকে জামাই হিসেবে মেনে নিবেন সেটা আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা। আর এই অকল্পনীয় কাজটি করে দেখিয়েছেন আমার মহীয়সী মা। পুরোপুরি আম্মুকেও যে ক্রেডিট দেওয়া যায় তা-ও না। আমার তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া আব্বু সহ্য করতে পারেনি। তাছাড়া গতকালই নাকি অয়ন ভাইয়াও এই ব্যাপারে আব্বুকে খুব অনুরোধ করেছিলেন। সকলের প্রচেষ্টায় দুই চড়ুইয়ের সন্ধি বাস্তবায়ন হলো। আমার এই মুহূর্তে কেমন লজ্জা লাগছে। এমন লাজুকলতা আমাকে আগে কখোনোই স্পর্শ করেনি। একদিনের ব্যবধানে জীবনের এই বিশাল পরিবর্তন আমাকে হিতাহিত হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। অতিরিক্ত খুশিতে আব্বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেছিলাম কবুল বলার পর। আব্বুও এই প্রথম কাঁদলেন। আমার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে অভ্রকে গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন-
-ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার সহজ সরল মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেলেছো অভ্র। যদি ওকে কখনো কষ্ট দিয়েছো শুনি? তোমার চৌদ্দ গুষ্টিকে জেলের ভাত খাওয়াবো জেনে রাখো।
উত্তরে অভ্র মিষ্টি হাসলো। তারপর সামনে এসে আব্বুকে আরেক পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল-
-আমি ওকে আপনার চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারবো কিনা জানিনা আঙ্কেল। ওকে আপনি যেভাবে রেখেছেন আমি হয়তো তেমন চেষ্টা করেও আপনার যায়গা কোনো দিনই নিতে পারবোনা। তবে আপনার পর মিতুকে আমার মতোন করে কেউ ভালো রাখতে পারবেনা এতোটুকু আত্নবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি। নিশ্চিত থাকুক আমি বেঁচে থাকতে ওঁকে কোনো দুঃখেরা স্পর্শ করতে পারবেনা।
উত্তরে আব্বুর চোখ খুশিতে ছলছল হয়ে গিয়েছিল। আমার মনে হচ্ছিল, বোধহয় এরচেয়ে প্রশান্তিময় দৃশ্য পৃথিবীতে অন্যটি নেই!
-কিরে মামা,তোর বন্ধুতো বরটা কই গিয়ে বসে আছে? বাশর টাশর করার ইচ্ছে টিচ্ছে নাই নাকি শালার? এতোদিন দেবদাসপনা করে এখন বউ পাইয়া আর খোঁজ নাই। পালাইসে নাকি খবর নে তো।
সিফাতের কথায় জবাবে আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ কন্ঠে বললাম-
-বাশর করার সুযোগ তোরা দিলে তো? এতো কাটখোড় পুড়িয়ে বিয়েটা করলাম,আর তোরা কিনা সোজা আমার বাশর ঘরে এসে পা তুলে বসে আছিস? এমন দখলদারিত্বতা আমার বরের সহ্য হয়নি বোধহয়। তোদের যন্ত্রণায় আমার বর কই গিয়ে দুঃখবিলাস করছে কে জানে?
আমার কথায় ওরা ভুত দেখার ন্যায় হা করে একসাথে তাকালো। জাহিদ কিছুক্ষণ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বললো-
-আরিব্বাসসস! বিয়ে হইলে যে মানুষ লজ্জা শরম সব খাইয়া বইসা থাকে এই থিউরি তো জানা ছিলো না। তুই কি আগে থেকেই এমন রে মিতু? নাকি খুশিতে লাজ লজ্জা খাইয়া বইসা আছোস? তুমি তো এমন ছিলেনা বন্ধু কাহিনি কি হুম? বিয়ের রাত না পেরোতেই বশীভূত হয়ে গেলে?
মেঘা ওর মাথায় চাট্টি মেরে বললো-
-তোর এতো থিউরি জানার প্রয়োজন নাই। তুই তো বিয়া ছাড়াই বশীভূত। আর তাছাড়া, এভরিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার । প্রেম যদি পরিবর্তনই না আনে তবে সেটা আবার কিসের প্রেম?
রুম্পা ফোঁড়ন কেটে বললো-
-তুই এসব থিউরি জানিস কি করে? তলে তলে কার সাথে প্রেম প্রেম খেলছো শুনি?
সিফাত সহমত পোষণ করে বললো-
-ঠিক কইসোস,এইটার হাবভাব ইদানিং কেমন রহস্যময় রহস্যময় লাগে। যদি এমন কিছু হয়, তাইলে আমি কনফার্ম ওইটা রিফাত ছাড়া আর কেউ না।
ওর কথা শেষ না হতেই মেঘা ধুম করে পিঠে কিল বসিয়ে দিল। তারপর ওর চুলগুলো মুঠোয় নিয়ে টানতে টানতে বললো
-রিফাতের কোন ভ্যালু আছে আমার লাইফে? এই ফার্মের মুরগীর সাথে আমি প্রেম করতে যাবো? এমন মারাত্মক এলিগেশন দেওয়ার মতোন কুটিল বুদ্ধি কই পাস তুই হারামি?
রিফাত উই মা করতে করতে কোনো মতে হাতে পায়ে ধরে ওর হাত থেকে নিজের অতি সুদর্শন চুলগুলোকে রক্ষা করে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো-
-জংলী মহিলা!
ওদের ঝগড়ার মাঝেই অভ্রের আগমন ঘটলো। পকেটে হাত ঢুকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রুমে ঢুকে হাতের ঘড়িটা খুলে রাখতে রাখতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার সবাইকে দেখে নিয়ে চোখে মুখে গাম্ভীর্যভাব ধরে রেখে শুধালো-
-তোদের এখানে কি?
সিফাত বেশ আগ্রহ নিয়ে দাঁত কেলিয়ে জবাব দিল -
-তোদের বাশর দেখতে আসছি দোস্ত।
ওর কথা শুনে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। বাকিরা ঠোঁট টিপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করলো। অভ্র কিছুক্ষণ শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো-
-দশ সেকেন্ডের মধ্যে বিদেয় হ। এক সেকেন্ডও যেনো বেশি না হয়।
অভ্রের কঠিন নির্দেশে কতোটুকু ফায়দা হলো বুঝতে পারলামনা। সিফাত আবেগাপ্লুত হওয়ার ভান করে ছলছল চোখে বলতে লাগলো -
-এভাবে বলতে পারলা বন্ধু? আজ বিয়ে করসো বলে বউয়ের কথায় উঠবে আর বসবে? তুমি আর তোমার বউ মিলে যে কুটনৈতিক চাল চালছো সেটা কি আমাদের বোধগম্য হয়নি ভেবেছো? বিয়েশাদি শেষ, সোনার বাংলাদেশ? মনে রাইখো তোমার ক্রিকেট টিমদের পয়দাক্ষণে আমরাই গার্জিয়ানদের ভূমিকা পালন করবো হু।
মুহুর্তেই বাকিরা শব্দ করে হেসে ফেললো। ওর কথায় অভ্র ভ্রু বাঁকিয়ে একপলক তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে মুখে চ সূচক শব্দ করে বললো-
-তুই দশ সেকেন্ড অতিক্রম করে ফেলেছিস।
সিফাত পূনরায় ঠোঁট উল্টে বললো-
-একটু বাশরই তো দেখতে এসেছিলাম,এটা কি খুব বড় অন্যায় হয়ে গেলো?
মেঘা মাথা দুই দিকে বাঁকিয়ে বোঝালো,না এটা মোটেও কোনো অন্যায়ের কাতারে পরেনা। এটা তো বড়ই পূন্যের কথা।
-পৃথিবী বড়ই নিষ্ঠুর রে মেঘা! সারাবছর চোখের সামনে প্রেম প্রেম খেলা, এখন বাশর করার বেলায় গোপনে গোপনে চুপিচুপি সেরে ফেলা।
ওর কথায় আমরা সকলে যেনো আকাশ থেকে পড়লাম। অভ্র কিছুক্ষণ অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকাতেই এক দৌঁড়ে সিফাত উধাউ হয়ে গেলো। বাকিরাও ওর পেছন পেছন ছুট লাগালো।
বেশ অনেকক্ষণ পর অভ্র ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরলো। আমি তখনো নাক অব্ধি ঘোমটা টেনে নববধূ সেজে বসে আছি।
-এহেম এহেম।
অভ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ সূচক কাশির শব্দেও আমি ঘোমটা তুলে তাকালাম না। আমার মনোযোগ পেতে ও এবার আস্তে আস্তে আমার পাশে এসে বসলো। তারপর আলতো করে আমার হাতটা মুঠোয় করে বললো-
-চাঁদমুখটা দেখার সৌভাগ্য হবে কি মিসেস অভ্র?
আমি কোনো জবাব দিলামনা। খুব লজ্জা লাগছে আমার। লজ্জায় কোথায় নিজেকে আড়াল করবো বুঝতে পারলামনা। অভ্র বেশ কিছুক্ষণ থম মেরে বসে বিরক্তি নিয়ে বললো-
-ধুর বাল! ওড়না সরা তো।
আমি ওর চেয়ে দ্বিগুণ চেচিয়ে বলে উঠলাম-
-গর্ধব! ঘুমটা কি আমি নিজে নিজে তুলবো নাকি তুই তুলে দিবি? মুভিতে দেখিসনা নাইকা রা লজ্জাবতী লতার মতোন নাক পর্যন্ত ঘোমটা নামিয়ে বাশর ঘরে বসে থাকে আর নায়ক রা আস্তে আস্তে ঘুমটা তুলে বলে "মাশাআল্লাহ অপূর্ব!" এর জন্যই আব্বু সমবয়সী ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায়নি। সব বুঝিয়ে দিতে হবে তাকে আমার।
আমি অভ্রের মুখ না দেখতে পেলেও স্পষ্ট উপলব্ধি করলাম ও বেশ ভালোই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো। আমি এমন কিছু বলে বসবো বেচারা হয়তো আচ করতে পারেনি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে অভ্র এবার আমার কানের কাছে এসে মুখে শয়তানি হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগলো-
-সমবয়সী বর কি কি করতে পারে দেখতে চাস?
আমি আঁতকে উঠলাম। ঘোমটা সরিয়ে ওর দিকে গরম দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই অভ্র তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বুকে হাত দিয়ে বললো-
-হায়ে! জীবন সার্থক রে। প্রতিদিন রাতে এই রুপের আলিঙ্গনে মগ্ন থাকবো আবার চোখ মেলেও এই রুপই দেখতে পাবো। আহা! জীবনে আর কি প্রয়োজন আমার?
ওর কথায় আমার রাগ মিয়িয়ে গেলো।আমি মুখ ফিরিয়ে লাজুক হাসলাম। অভ্র তৃপ্তি নিয়ে চেয়ে রইলো আমার হাসিভরা মুখে। আমিও পলকহীন চোখে চেয়ে আস্কারা দিলাম ওর অবাধ্য চোখদুটোকে। কিছুক্ষণ শান্ত চোখে কথোপকথনের পর আমি লজ্জায় নিজের মুখ লুকিয়ে নিলাম ওর বুকে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলাম ওকে। এই স্বর্গীয় দিন আমাকে ঠিক স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ডুবিয়ে রাখতে চাইলো। সে আমার অধিকার। আমার বৈধ অধিকার। আর কোনো বিপত্তি পোহাতে হবেনা তাঁর বুকে মাথা ঠেকাতে ইচ্ছে হলে। আমার চোখে পানি। দুঃখ না তৃপ্তিময়তার অশ্রু। আমি ওর বুকে মুখ ডুবিয়ে আকুল কন্ঠে বলে উঠলাম-
-আমাকে ভালো করে জড়িয়ে ধর না অভ্র! সমস্ত ভালোবাসা জড়িয়ে আমাকে শক্ত করে ধর প্লিজ।
অভ্র ধমকের স্বরে বললো-
-একটা থাপ্পড় লাগাবো। স্বামীর প্রতি কোনো সম্মানবোধ নেই? আনরোমান্টিক মহিলা! তুমি করে বল।
আমি ভ্রু বাঁকিয়ে শুধালাম-
-তা আপনি বুঝি বিয়ের রাতে নববধূকে তুই তুকারি করে খুব সম্মান প্রদর্শন করছেন?
অভ্র হেঁসে ফেললো। তারপর মৃদু স্বরে বললো-
-একবার তুমি করে বলো না প্লিজ!
আমি ওর গালে আমার নরম হাতটা রেখে মিষ্টি কন্ঠে বললাম-
-ওগো শুনছো?
অভ্র আমায় প্রশ্রয় দিয়ে বললো-
-শুনছি তো জান!
-বউ তোমাকে খুব ভালোবাসে। বলেছিলাম না? যেদিন তোমার মায়ের বাঁদর ছেলেটা আমাকে বিয়ে করবে সেদিনই ভালোবাসি বলে দেব। রেখেছি তো কথা?
অভ্র মৃদু হেঁসে জবাব দিল-
-খুব রেখেছো বউ!
অভ্র আমার ব্যান্ডেজ করা পায়ে তাকালো। অসহায় মুখ করে আমার দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো-
-তুই আমাকে এতোটা ভালোবাসিস!
অভ্রের চোখের কোনা জ্বলজ্বল করতে লাগলো সমুদ্রের নীল জলের মতো।কিছুক্ষণ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমি দেখলাম সে-ই সমুদ্রের ঢেউ। অভ্র গায়ের পাঞ্জাবীটা খুলে উন্মুক্ত করে দিল ওর প্রসস্থ পুরুষালি গা টা। এই প্রথম অভ্রকে এমন রুপে দেখলাম আমি। আমার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠলো। ড্রিমলাইটের মৃদু আলোতেও চওড়া শরীরটা চকচক করতে লাগলো। আমার মনে হল,পৃথিবীতে এর চেয়ে সুদর্শন পুরুষ অনত্র নেই। কেবল সে-ই একমাত্র আকর্ষণীয় পুরুষ! আমি গর্বিত ঠোঁটে হাসলাম। অভ্র অবশ্য অবাকই হল। নির্লিপ্ত স্বরে বললো-
-হাসছিস কেন? ডরভয় নেই?
আমি মাথা দু'দিকে দুলিয়ে বোঝালাম আমার ভয় নেই।
অভ্র নির্লিপ্ত হেসে সরু চোখে চেয়ে বললো-
-সর্বনাশ কিন্তু একটা ঘটিয়ে ফেলবো। বুঝে নিস।
আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।
-ডিল ডান। দেখতে ইচ্ছে করছে কি সর্বনাশ অপেক্ষা করছে আমার জন্য।
অভ্র আকস্মিক আমার কোমর খামচে ধরলো। মৃদু ব্যথা অনুভব করলেও আমি মুখে কোনো শব্দ করলাম না। আমার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। অভ্র ভ্রু বাঁকিয়ে শুধালো-
-সর্বনাশ দেখার খুব সখ হয়েছে?
আমি মাথা উপরনিচ করলাম। তারপর মুগ্ধ হেসে ওর গালে আমার নরম ঠোঁটের স্পর্শ আলতো করে বসিয়ে দিলাম। অভ্র বিস্মিত নয়নে কিছুক্ষণ ড্যাবড্যাব করে গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রইলো। এ যেনো পাখিকে সাঁতরাতে দেখার মতো অবিশ্বাস্য দৃশ্য। ওর মুখটা দেখে আমার যে কী হাসি পাচ্ছিল! যাক বেটাকে ভালোই জব্দ করেছি তাহলে। কিন্তু না। আমার চেতনাকে রীতিমতো বুড়ু আঙুল দেখিয়ে ও ফট করে আমার গালে কামড় বসিয়ে দিল। বুঝলাম শয়তানটাকে এতোটা প্রশ্রয় দেওয়া উচিৎ হয়নি। আমার সান্নিধ্য পেয়ে প্রশ্রয়ে সে-ই বেপরোয়া পুরুষ মাদক দৃষ্টিতে তাকালো। মুখে দুষ্টু হাসি এঁকে নিজের তপ্ত হাতের স্পর্শ বসিয়ে দিল আমার লতানো কোমড়টায়। কোমড়ে হাল্কা চাপ অনুভব হতেই আমি আঁতকে উঠে ওর চোখের দিকে তাকালাম। ও আমার কৌতুহলী কোমল চোখের পরোয়া না করে কেমন ঝড়ের গতিতে উন্মাদের মতোন মুখ ডুবিয়ে দিলে আমার ঘাড়ে। ওর উষ্ণ ঠোঁটের স্পর্শে আমার সর্বাঙ্গ হিমালয়ের বরফ চূড়ার মতো শীতল হয়ে উঠলো। তাঁর উষ্ণ আলিঙ্গনে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লাম আমি। এই আলিঙ্গনের ঠিক কি নাম দেয়া যায় আমার জানা নেই। তবে আমি যে ক্ষণে ক্ষণে চৈতন্য হারিয়ে ফেলার মতো অস্থির হয়ে উঠেছি সেটা স্পষ্ট টের পেলাম। কেমন অদ্ভুত শিহরণ! পাগলা ঘোড়ার মতোন অবাধ্যতা দেখাতে লাগলো ওরর হাতদুটোও। আমার ঘাড়ের সাথে নিজের ঠোঁটের গভীর প্রেম জমানো শেষ করে এবার নিজের তপ্ত ঠোঁটদুটোর স্পর্শ বসিয়ে দিলো আমার ওষ্ঠদ্বয়ে
আমার নরম মুখটা তাঁর খোঁচা খোঁচা পুরুষালী দাঁড়ির উষ্ণ স্পর্শের ছোঁয়ায় কেঁপে কেঁপে উঠলো। বসন্তের মতো উষ্ণ, আর বর্ষার মতো প্রশান্তিময়! অনেকটা সময় কেটে গেলো। অভ্র শান্ত হলো। তখনো ওর নিশ্বাস ঘোড়ার গতির মতো ছুটছে। বেশ কিছুক্ষণ পর মুখের উপর থাকা তাঁর অবাধ্য স্বরটা আমার কানের কাছে এসে একটা উষ্ণ তৃপ্তির শ্বাস ফেলে পূনরায় জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো-
-"আমার চোখেই তোর আজন্ম সর্বনাশ!"
বিঃদ্র 'তাঁর চোখে আমার সর্বনাশ' গল্প নিয়ে আমার অনুভুতি লিখতে বসলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়বো। এই গল্পটা সম্পূর্ণ আমার আবেগ থেকে আসা গল্প। প্রতিদিন এটার একেকটা পর্ব লিখেছি আর পাঠক-পাঠিকাদের আগে নিজের কাছে ভালো লাগার উপযুক্ত করে তুলেছি,নিজে অনুভব করেছি গল্পের চরিত্রগুলোকে। আমি জানিনা এই গল্পটা পাঠকমনে কতোটুকু জায়গা করতে পারবে। তবে আমি বিশ্বাস রাখবো মন্দ হলেও আপনারা আমায় উৎসাহ দিতে কোনো কার্পণ্য করবেন না। অনেকের প্রশ্ন থাকতে পারে " অভ্রের কানাডায় যাওয়ার ব্যাপারটা ক্লিয়ার কেনো করলামনা"। সত্যি বলতে এই গল্পটা টেনে হেচরে আরো বড় করার ইচ্ছে ছিল আমার। সময় স্বল্পতার কারনে তা হয়ে উঠলোনা বলে খুবই দুঃখিত। তবে প্রথম টা যদি পাঠক মনে যায়গা করতে পারে, পাঠকরা যদি দেখতে চায় অভ্র, মিতুর দাম্পত্য জীবন আসলে কেমন হয়। তাহলে আমি অবশ্যই এটার সিজন ২ নিয়ে আসবো। তখন ব্যাপারটা ক্লিয়ার হয়ে যাবে। আর এতোগুলা দিন ধরে ধৈর্য নিয়ে আমার মতোন ছোট্ট লেখিকার গল্পের অপেক্ষা করার জন্য আপনাদের অনেক অনেক ভালোবাসা।
